আজ ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি :
আজ ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস। একাত্তরের এইদিনে ময়মনসিংহ
মুক্ত হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে। দামাল ছেলেরা ওড়ায় বিজয়ের পতাকা।
ময়মনসিংহ জেলায় মুজিব নগর সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ
এফএফ, এমএফ, বিএলএফ এবং স্থানীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রায় ৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেন। নিজ জেলা শত্রুমুক্ত
করতে গিয়ে প্রায় দেড়শ’ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
জানা গেছে, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র দেশের মতো ময়মনসিংহবাসীও জীবন
বাজি রেখে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সংগ্রামী ছাত্র-জনতা ২৭ মার্চ শহরের খাগডহর এলাকার তৎকালীন ইপিআর
ক্যাম্প ঘেরাও করেন।
ক্যাম্পে থাকা ইপিআরের বাংলাদেশি সদস্যরা
ছাত্র-জনতার সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করেন। দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার সম্মুখ যুদ্ধের পর ১২১ জন পাক বাহিনীর সদস্য
নিহত হয় এবং ১৭ জন আত্মসমর্পণ করে।
এসময় শাহাদৎ বরণ করেন দুইজন মুক্তিযোদ্ধা। ইপিআর ক্যাম্প থেকে
১৪৭২টি রাইফেল, ২৮টি এলএমজি ও স্টেনগান, ৩৫ হাজার রাইফেলের গুলি এবং ৩৬ হাজার স্টেনগানের গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের
হাতে আসে। তখন থেকেই গোটা ময়মনসিংহ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
ময়মনসিংহের সংগ্রামী নেতা মরহুম রফিক উদ্দিন
ভূঞার নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ এবং আনসার-মুজাহিদ বাহিনীর বাংলাদেশি সদস্যরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে
পড়েন। মুক্তিযোদ্ধারা সংগ্রাম
পরিষদ গঠন করে সিটি ও মহাকালী স্কুলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করে পার্শ্ববর্তী জেলার
সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে জেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের
মাঠে বাঁশের লাঠি দিয়ে রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। ৯ মার্চ তৎকালীন মেজর
কেএম শফিউল্লাহ ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত
এমএনএ এবং এমপিদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক বৈঠক করেন।
৫ এপ্রিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য
ড. ফজলুল করিম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ছাত্র-শিক্ষক কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান
জানান। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত
ময়মনসিংহ অঞ্চল মুক্তিবাহিনীর দখলে থাকে।
২৯ এপ্রিল সর্বশেষ হালুয়াঘাটের পানিহাতা ক্যাম্প
মুক্তিযোদ্ধাদের হাত ছাড়া হলে হাজার হাজার মুক্তিপাগল জনতা ভারতের মেঘালয় রাজ্যে আশ্রয়
নেন এবং ইয়ুথ ক্যাম্পের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে এফএফ এবং বিএলএফ
প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে জেলার বিভিন্ন রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
অত্র অঞ্চলের যুবকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢালু
ইয়ুথ ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এবং শিববাড়ি ইয়ুথ ক্যাম্পের প্রধান
ছিলেন হাতেম আলী তালুকদার এমপি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় যুবশিবির প্রধান অধ্যক্ষ
মতিউর রহমান এমপি বলেন, ‘‘দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ
চলাকালে ময়মনসিংহে বেশ কিছু সম্মুখ যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধারা অংশগ্রহণ করেন। এসব যুদ্ধে অসংখ্য
পাকসেনা ও রাজাকার নিহত হয়।’’
৩ ডিসেম্বর থেকে চারদিক দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা
পাকসেনাদের বাধা অতিক্রম করে ময়মনসিংহ শহরের দিকে আসতে থাকেন এবং ১০ ডিসেম্বর ভোরে
শহরে প্রবেশ করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে পাকসেনারা ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার দিকে পালিয়ে যায় বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘‘১০ ডিসেম্বর সকালে শহরের সার্কিট হাউসে এসে এফজে সেক্টেরের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার
সান সিং বাবাজীকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ময়মনসিংহকে শত্রুমুক্ত
ঘোষণা করেন।’’
ময়মনসিংহ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের
কমান্ডার সেলিম সরকার রবার্ট বলেন, ‘‘ওইদিন সার্কিট
হাউস থেকে বের করা হয় বিশাল বিজয় মিছিল। বিজয়ের আনন্দে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবণিতা যোগ
দেন মুক্তির আনন্দ মিছিলে।’’
(সূত্র- বাংলানিউজ)
