মুক্তাগাছায় জমিদার পরিবারের সংসার চলে সুপারি বেচে !
স্টাফ রিপোর্টার ● নান্দাইল নিউজ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় এক জমিদার পরিবারের আজ পথে বসার উপক্রম। মুক্তাগাছাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের জমিদারির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
থাকলেও সবই আজ বেদখলে। জমিদারের দুই নাতনির লেখাপড়া চলছে কলেজ কর্তৃপক্ষের
দয়ায়। সংসার চলছে সুপারি, নারিকেল বিক্রি
করে।
জানা যায়, মুক্তাগাছার প্রখ্যাত জমিদার বকুল কিশোর আচার্য
চৌধুরীকে (ডাবল এমএ) ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায় এবং ময়মনসিংহ
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে নির্মমভাবে গুলি করে তাকে মারে পাক
হানাদার বাহিনী। এরপর তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সবই একে
একে বেদখল হয়ে যায়। জমিদার বকুল কিশোর আচার্য চৌধুরীর বাড়িটি
সরকার অধিগ্রহণ করে নেয়। বর্তমানে জমিদার বাড়িটি
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
জমিদার বকুল কিশোর আচার্য চৌধুরীর পুত্র দেবাশীষ আচার্য চৌধুরী (টুবলু) ২০০২ সালে
স্ত্রী ও তিন মেয়ে রেখে পরলোক গমন করেন। টুবলুর মৃত্যুর পর
তার পরিবারে নেমে আসে অভাব। শ্বশুরের জমিদারির
শেষচিহ্ন জীর্ণ এক কাচারি বাড়িতে নিদারুণ অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন টুবলুর স্ত্রী শিপ্রা
আচার্য চৌধুরী (৫০) তার মেঝ মেয়ে দিপাঞ্জনা আচার্য চৌধুরী (আনন্দ মোহন কলেজের এমএ শেষ
বর্ষের ছাত্রী) ও ছোট মেয়ে দেবজানী আচার্য চৌধুরী পিয়ালকে (হাজী কাশেম আলী মহিলা ডিগ্রি
কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী) নিয়ে। শহীদ স্মৃতি সরকারি
কলেজে পড়ুয়া বড় মেয়ে অর্পিতা আচার্য চৌধুরী বিয়ের পর স্বামীর সাথে বর্তমানে দিনাজপুরে
বসবাস করছেন। শিপ্রা আচার্য চৌধুরী দুঃখ করে বলেন,
বলতে লজ্জা লাগে আমরা এখন নামেই জমিদার পরিবার। সংসার চলছে ভাঙ্গা কাচারি বাড়ির গাছের
সুপারি, নারিকেল বিক্রি করে। দুবেলা দুমুঠো অন্নই যেখানে জুটছে না, সেখানে আবার
মেয়েদের লেখাপড়া। হাজী কাশেম আলী কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের আর্থিক
দৈন্যতার কথা বিবেচনা করে ছোট মেয়ের লেখাপড়ার খরচ ফ্রি করে দিয়েছে। অপরের দয়া-দাক্ষিণ্যে আমাদের চলতে হবে তা কোনদিনই ভাবিনি। এখনো আমাদের যে সম্পত্তি আছে তা দিয়ে ভালোই চলতে পারতাম। কিন্তু সবই বেদখলে
থাকায় সে সুবিধাটুকু থেকেও আমরা বঞ্চিত।
তিনি জানান, সরকার ১৯৭৫ সালে আমাদের বাড়িসহ (বর্তমানে
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প) ৪ একর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে। মূল্য নির্ধারণ করে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। সেই টাকা আমার স্বামীর
নামে বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আজো সেই টাকা আমরা
পাইনি। ময়মনসিংহ ভূমি অধিগ্রহণ অফিস আমার স্বামীর নামে চিঠি দিয়েছে
যেটি এখনো অবমুক্ত হয়নি। তিনি বলেন,
গত এক বছর ধরে অফিসে ঘোরাফেরা করে যাচ্ছি। টাকা পাচ্ছি না। যথাসময়ে টাকাগুলো পেলে আমাদের খুবই উপকারে
আসতো।
শিপ্রা আচার্য চৌধুরী বলেন, ময়মনসিংহের ভালুকা,
গফরগাঁও, গাজীপুর, জয়দেবপুর, বগুড়া, বরিশাল, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন
স্থানে এখনো আমাদের ভূ-সম্পত্তি রয়েছে। সেগুলোর দখলদারগণ আমার
কাছে আসেন।
তারা নগদ টাকা দিয়ে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর চান। কিন্তু আমি টাকা নেই না। স্বাক্ষরও দেই না। আমি তাদের বলি, তোমরা আমাদের নামে ঝামেলামুক্ত কাগজ তৈরি
করে নিয়ে আসো, তারপর বিক্রির কথা ভাববো। না বুঝে না জেনে স্বাক্ষর দিলে ঝামেলা হবে বলে মনে করি। আমি চাই না জমিদার বংশের উপর কোন কালিমা লেপন করতে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে -এটাই প্রত্যাশা তার।
